বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী খুন ও শাস্তি: ৩০২ ধারার উপর একটি পর্যালোচনা
বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায়, দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এর ৩০২ ধারা একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ—খুন—মোকাবেলার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই বিধানটি সরাসরি খুনের সংজ্ঞা প্রদান করে না, তবে এর জন্য নির্ধারিত শাস্তির বিধান করে, যা এটিকে দেশের আইনি কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত ধারায় পরিণত করেছে। ৩০২ ধারা বোঝার জন্য খুনের সংজ্ঞা, বিচার প্রক্রিয়া এবং আদালত বছরের পর বছর ধরে আইনটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেছে, তা জানা অপরিহার্য।
আইন: খুন কী এবং এর শাস্তি?
৩০২ ধারার অধীনে কোনো অভিযোগের আইনি ভিত্তি স্থাপিত হয় দণ্ডবিধির ৩০০ ধারায়, যেখানে খুনের (কতল-ই-আমদ) সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একটি কাজকে খুন হিসেবে গণ্য করা হয় যদি তা নিম্নলিখিত অভিপ্রায়ে করা হয়:
১. মৃত্যু ঘটানোর উদ্দেশ্যে।
২. এমন শারীরিক আঘাত করার উদ্দেশ্যে, যা অপরাধী জানে যে যার ক্ষতি করা হচ্ছে তার মৃত্যু ঘটাতে পারে।
৩. এমন শারীরিক আঘাত করার উদ্দেশ্যে যা স্বাভাবিক প্রকৃতির গতিতে মৃত্যু ঘটানোর জন্য যথেষ্ট।
৪. কোনো অজুহাত ছাড়াই এমন আসন্ন বিপজ্জনক কাজ করা যা দ্বারা মৃত্যু ঘটার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে বা এমন আঘাত লাগার সম্ভাবনা রয়েছে যা মৃত্যু ঘটাতে পারে।
যখন একটি কাজ ৩০০ ধারার অধীনে খুন হিসেবে প্রমাণিত হয়, তখন তার শাস্তি নির্ধারিত হয় ৩০২ ধারা অনুযায়ী। ধারাটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং কঠোর:
“যে ব্যক্তি খুন করে, সে ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং তদুপরি অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবে।”
এই ধারাটি আদালতকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড আরোপের विवेচনামূলক ক্ষমতা প্রদান করে। এই দুটি শাস্তির মধ্যে কোনটি প্রয়োগ করা হবে, তা মূলত মামলার নির্দিষ্ট পরিস্থিতি, যেমন—অপরাধের নৃশংসতা, উদ্দেশ্য এবং অপরাধীর চরিত্রের উপর নির্ভর করে।
বিচার ব্যবস্থা: এজাহার থেকে রায় পর্যন্ত
৩০২ ধারার অধীনে একটি মামলা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় একটি কঠোর এবং বহুস্তরীয় বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, যা মূলত দায়রা আদালত দ্বারা পরিচালিত হয়।
১. প্রাথমিক তথ্য বিবরণী (FIR): কোনো হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার পর স্থানীয় থানায় পুলিশ কর্তৃক এজাহার দায়েরের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি শুরু হয়।
২. তদন্ত: পুলিশ একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত পরিচালনা করে, যার মধ্যে রয়েছে অপরাধস্থল পরিদর্শন, প্রমাণ সংগ্রহ (যেমন—অস্ত্র, ফরেনসিক নমুনা), সাক্ষীদের বিবৃতি রেকর্ড করা এবং ময়নাতদন্ত পরিচালনা করা।
৩. অভিযোগপত্র (Charge Sheet): তদন্তে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে পুলিশ উপযুক্ত ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে “অভিযোগপত্র” দাখিল করে (অপর্যাপ্ত প্রমাণ থাকলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়)।
৪. অভিযোগ গঠন: এরপর মামলাটি দায়রা আদালতে স্থানান্তর করা হয়। বিচারক প্রমাণাদি পরীক্ষা করেন এবং যদি প্রাথমিকভাবে একটি মামলা প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তিনি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ৩০২ ধারার অধীনে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করেন। এরপর অভিযুক্তকে দোষ স্বীকার বা অস্বীকার করার সুযোগ দেওয়া হয়।
৫. বিচার ও সাক্ষ্য গ্রহণ: রাষ্ট্রপক্ষ “সন্দেহাতীতভাবে” অভিযুক্তের দোষ প্রমাণের জন্য তাদের প্রমাণ এবং সাক্ষীদের উপস্থাপন করে। আসামিপক্ষের সেই সাক্ষীদের জেরা করার অধিকার থাকে। এরপর, আসামিপক্ষ তাদের নিজস্ব সাক্ষী এবং প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারে।
৬. আসামির জবানবন্দি: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ৩৪২ ধারা অনুযায়ী, অভিযুক্তকে তার বিরুদ্ধে উপস্থাপিত প্রমাণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
৭. চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক: রাষ্ট্রপক্ষ এবং আসামিপক্ষ উভয়ই তাদের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে, যেখানে প্রমাণ এবং আইনি বিষয়গুলির সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়।
৮. রায়: দায়রা জজ চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। অভিযুক্ত দোষী সাব্যস্ত হলে, বিচারক শাস্তি ঘোষণা করেন—হয় মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
৯. আপিল ও অনুমোদন: মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হলে, সেই রায়টি অবশ্যই বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ দ্বারা অনুমোদিত হতে হয়, যা “ডেথ রেফারেন্স” বা মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন হিসেবে পরিচিত। দণ্ডিত ব্যক্তিরও হাইকোর্ট বিভাগে এবং পরবর্তীতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগে আপিল করার অধিকার রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ মামলা: আইনের প্রায়োগিক ব্যাখ্যা
বিচারিক দৃষ্টান্ত ৩০২ ধারার প্রয়োগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আদালত ধারাবাহিকভাবে মত দিয়েছে যে মৃত্যুদণ্ড কেবল “বিরল থেকে বিরলতম” মামলার জন্য সংরক্ষিত হওয়া উচিত, যেখানে অপরাধটি অত্যন্ত নৃশংস এবং সমাজের বিবেককে নাড়া দেয়।
একটি উল্লেখযোগ্য মামলা হলো রাষ্ট্র বনাম ঐশী রহমান (২০১৭)। ঐশী রহমানকে তার বাবা-মা, একজন পুলিশ পরিদর্শক এবং তার স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। বিচারিক আদালত তাকে ৩০২ ধারার অধীনে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। তবে, আপিলের পর হাইকোর্ট বিভাগ তার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। আদালত রায়ের ক্ষেত্রে কিছু প্রশমনকারী বিষয় বিবেচনা করেছিল, যার মধ্যে রয়েছে অপরাধের সময় তার বয়স (তিনি ১৯ বছর বয়সী ছিলেন), তার নথিভুক্ত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং তিনি নিজেই পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। এই মামলাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যা দেখায় বিচার বিভাগ কীভাবে ৩০২ ধারায় নির্ধারিত দুটি শাস্তির মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার সময় অপরাধের গুরুত্বের সাথে প্রশমনকারী পরিস্থিতিগুলোর ভারসাম্য রক্ষা করে।
উপসংহারে, দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা বাংলাদেশে খুনের মতো অপরাধকে শাস্তি দেওয়ার চূড়ান্ত আইনি হাতিয়ার। এর প্রয়োগ একটি কাঠামোবদ্ধ বিচার প্রক্রিয়া এবং বিচারিক দৃষ্টান্ত দ্বারা পরিচালিত হয়, যা একটি সতর্ক ও প্রমাণ-ভিত্তিক পদ্ধতির উপর জোর দেয়, যাতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়, তা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মাধ্যমেই হোক বা মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত শাস্তির মাধ্যমেই হোক।